ওরা দুইই খারাপ, তাই ভাল'র অভিমান হয়েছে!
রীতা রায় মিঠু , মঙ্গলবার, নভেম্বর ০৫, ২০১৩


আমার এক অনুজপ্রতিম বন্ধু, এর মধ্যেই অনেক বই লিখে প্রকাশ করেছে, কিছুদিন আগেও বই প্রকাশের ব্যাপারে আমাকে অনেক উৎসাহ দিত, বই নিয়ে আমরা অনেক কথা বলতাম, এরপর আমি খুব বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়ি বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে নিয়ে, বইয়ের কথা ভুলে যাই, বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনাকে নিয়ে স্ট্যাটাসের পর স্ট্যাটাস দেই, পজিটিভ এবং নেগেটিভ, প্রচুর ফীডব্যাক পাই, কিন্তু আমার সেই অনুজপ্রতীম বন্ধুর কাছ থেকে আর কোন সাড়া পাইনা।
গতকাল বন্ধু আমাকে বার্থডে উইশ করার সময় মোটামুটি দীর্ঘ মেসেজ পাঠিয়েছে, সেই মেসেজ পড়েই বুঝলাম, কেন ওর সাড়া পাইনি। মেসেজের মূল অংশ হুবহু তুলে দিলাম, এর প্রয়োজন ছিল।
"তুমি সবসময় পলিটিক্যাল স্ট্যাটাস দাও তাই আমি কোন মন্তব্য করি না। তুমি দেশের বাইরে আছ তাই কোন একটা দলের হয়ে কথা বলো। আমাদের দেশের দুই বৃহত্তম দলের মধ্যে মুলত: কোন তফাৎ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরণের একটা পরিবর্তন দরকার। এদেশের মানুষ মনে করে রাজনীতি করা মানে বাড়ি-গাড়ির মালিক হওয়া। এই স্বপ্নটা, এই ধারণাটা মুছে দেয়ার মতো একটা বড় ঝড় দরকার, যাতে করে এই সব স্বপ্ন বিলাসী মানুষ, উচ্চাভিলাষী মানুষ গাড়ি-বাড়ির স্বপ্ন বাদ দিয়ে জনগণের কল্যানের স্বপ্ন দেখে, গণতন্ত্র, সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকারের স্বপ্ন দেখে। আর কোন ঝড় না এলে বাংলাদেশের প্রধান দুই বৃহত্তম দল কখনোই জনগণের কল্যাণের কথা ভাববে না। তারা নিজেদের কথা ভাবে। একদল তার বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চায় অথচ তার দলের নেতাকর্মীরা তার বাবার, জাতির পিতার মতো কোট পরে টেন্ডারবাজি করে, দুনীতি করে আরেক দল স্বামীর আদর্শের কথা বলে অথচ তার দলের নেতাকর্মীরা সমানহারে দুনীতি করে। তুমি কাদের জন্য লিখছ? কোন দলের সাফাই না গেয়ে এদেশের মানুষের জন্য লিখ, তোমার মেধা, তোমার শ্রম কাজে লাগবে। অযাচিতভাবে উপদেশ দিলাম কিছু মনে করো না। আবারো বলি, অন্তরের অন্তস্থল থেকে বলি শুভ হোক তোমার জন্মদিন।"
আমরা ইদানিং নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে, মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলি, কখনও কখনও অন্যের মতামত বা মনোভাব এড়িয়ে যাই। এটি ঠিক হচ্ছে নাকি বেঠিক হচ্ছে, সে বিষয়ে ভাববার সময় এসেছে। কারণ অনেকের মত আমারও যারা প্রথম দিকের বন্ধু ছিল, তাদের অনেকেই আজ আমার ফ্রেন্ড লিস্টেই শুধু আছে, আমার পাশে নেই। কেউ কেউ আবার নীরবে আমাকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছে। আগে রাজনীতি নিয়ে কিছু লিখতামনা, তখন এই বন্ধুগুলো আমার সাথে কথা বলার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতো, বন্ধুদের সকলেই উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত এবং ভদ্র। এরাই সমাজের 'এলিট' শ্রেণীর প্রতিনিধি। আমিও ওদের সাথে গল্প করে অনেক আনন্দ পেয়েছি। এরপর যখন রাজনীতি নিয়ে মেতে উঠেছি, ওরা নীরবে সরে গেছে।
বন্ধুরা সরে গেছে বলে আমার কোন আপত্তি নেই, দুঃখ একটু হচ্ছে, তবে কেন ওরা সরে গেলো, এই ব্যাপারে খুব চিন্তিত বোধ করছি। কারণ আমি তো কোনরকম লুকোছাপা না করে, স্পষটভাবেই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কথা বলি। আমি বিশ্বাস করি, আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, তর্কাতীতভাবে এটি সত্যি। তবে একই সাথে আমি অস্বীকার করিনা, আওয়ামীলীগ ছাড়াও কিছু কিছু দল এবং মানুষ আছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলেন। আমার লেখা যাদের পছন্দ হয়না, যারা আওয়ামীলীগ বিরোধী রাজনৈতিক আদর্শ মনে লালন করে, তাদের অনেকেই আমাকে 'প্রবাসের বিলাসী জীবন ছেড়ে, দেশের কষ্টকর জীবনে ফিরে গিয়ে 'বড় বড় বুলি' আওড়াতে বলে। কেউ কেউ আমাকে 'রাজনৈতিক গালি' দেয় ( চামচা, বায়াসড, দালাল), কেউ কেউ বলে, এইসব রাজনৈতিক লেখা না লিখে 'কমেডি গল্প' লিখতে, নাহলে ট্র্যাজেডী গল্প। আমি খুশী মনে তা গ্রহণ করি, তারা সংখ্যায় খুব বেশী নয় ভেবে নিশ্চিন্ত বোধ করি। ভাবি, বাহ! এই ক'জন বাদ দিলে বাকীরা সকলেই আওয়ামীলীগের রাজনীতি সমর্থণ করে। তাহলে আর ভাবনা কি? নৌকায় চড়ে হাসু আপা আবার আসবেন।
সমস্যার শুরু হলো বন্ধুর মেসেজ পাওয়ার পর। খেয়াল করলাম, দিনে দিনে অনেক কিছুতেই বদল এসেছে, আজকাল দেখি শেখ হাসিনার সমালোচকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, পাকা জহুরী হারিয়ে যাচ্ছে, অনেকেই স্বচ্ছ স্ফটিককে 'ডায়মন্ড' ভাবতে শুরু করেছে, আর 'ডায়মন্ড'কে ভাবছে কাঁচ। তাদের সংখ্যা দ্রুতহারে বাড়ছে যারা মনে করে, দুই মহিলা দিয়ে দেশ আর চলবেনা। আমার বন্ধুদের মধ্যেও এই সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তারা বিষয়টিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি ওদের আদর্শ পরিপন্থী দলকে সমর্থন করি বলেই ওরা আমার সাথে 'বন্ধুত্বের' সম্পর্কের কথা ভুলে গেছে। এই বন্ধু তবুও আমাকে বার্থডে উইশ করতে ভুলেনি, কিন্তু আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধুরা আমাকে বার্থডে উইশ করতেও ভুলে গেছে, এমনও হতে পারে, আমাকে ওরা অনেক আগেই আনফ্রেন্ড করে দিয়েছে, এমন দলকানা বন্ধুর সাথে সম্পর্ক না রাখাকেই উত্তম মনে করেছে। এখানেই আমার ভয় এবং দুশ্চিন্তা। কারণ, তাদের সকলেই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমার বন্ধুটির মত করে বলতে চায়, " দুই দলই সমান, দুই নেত্রীই খারাপ, দুই রাজপুত্রই এক পদের, একজন দেশকে বাপের তালুক ভাবে, আরেকজন স্বামীর তালুক ভাবে, এদের নিয়ে লেখালেখি করার কোন মানেই নেই"।
এই ধরণের ডায়ালগ যারা দেয়, তাদেরকে ভীষণ 'অচেনা' মনে হয়। তাদের মনোভাব বুঝা অনেক কঠিন, এবং এই ধরণের মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তারা এই ধরণের গড়পড়তা কমেন্ট করার আগে দুইয়ের মধ্যে তুলনা করেনা, অথবা তুলনা করতে জানেনা। দুটি জিনিসের মধ্যে তুলনা না করেই কি করে বলে দেয়া যায় যে দুই-ই খারাপ? দুই-ই যদি খারাপ হয়, তাহলে ভাল 'তিন' কোথায়? 'তিন'এর অস্তিত্বই যদি না থাকে, তাহলে কিসের আশায়, কার আশায় বিদ্যমান 'দুই পক্ষকে' এক কাতারে এনে, হীরা আর স্ফটিকের একই মূল্যায়ন করে বাতিল করে দেবো? তাহলে অভাগা দেশটার কই হবে? এটি কই তাদের মনের কথা নাকি শেখ হাসিনার বিরোধীতা করার জন্য আমাদের কাছে 'মুখরক্ষা' কথা?
বন্ধুরা আমাকে এড়িয়ে না গিয়ে, তাদের কি উচিত নয় নিজেদের মতামত ব্যক্ত করা? "রাজনীতি ভদ্রলোকের বিষয় নয়" ভেবে মৌনব্রত অবলম্বন করে থাকলে কার বেশী ক্ষতি?, চুপ করে থাকলে তো আর দুই দলের বাইরে, দুই নেত্রীর বাইরে, বাপ আর স্বামীর আদর্শের বাইরে 'নতুন কোন দল, নতুন কোন নেতা ( মহিলা বাদ), নতুন কোন আদর্শের সৃষ্টি হবেনা। তাছাড়া দুই দলই যদি খারাপ হয়, তিন নাম্বার দলকে কোথায় পাব, সে ব্যাপারেও তো সহযোগীতা পেতে হবে! নাহলে আমরা যারা 'বায়াসড' পিপল, তারা তো আজীবন বংশানুক্রমিকভাবেই বায়াসড থেকে যাব, তখন কই হবে? নন-বায়াসড কোথায় পাব? বায়াসডদের তো চেনা যায়, এরা রঙ বদলায়না, প্রতিনিয়ত রঙ বদালানো অথবা 'তালাবন্ধ মুখ' নন-বায়াসডদের চিনবো কি করে? -রীতা রায় মিঠু