‘প্রতিবাদে গর্জে ওঠো’ মেয়েদের একটি নেটওয়ার্ক
বার্লিনের জানালা , বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ০৪, ২০১৩


ইদানীং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী নির্যাতন ও নারী ধর্ষণের ঘটনা শিউরে ওঠার মতো বেড়ে যাচ্ছে৷ অন্তত কোনো কোনো খবরের শিরোনাম দেখে এই ধারণাই হয়৷
আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে জার্মানি বা পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে নারীরা বুঝি মোটামুটি নিরাপদেই আছেন৷ কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায় ইউরোপ তথা জার্মানিতেও নানাভাবে নারীরা অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন৷ তবে এসবের চেহারাটা হয়ত খানিকটা ভিন্ন৷ পারিবারিক নির্যাতন থেকে শুরু করে, কর্মস্থলে, রাস্তাঘাটে সবজায়গাতেই মেয়েরা নিগ্রহ ও বৈষম্যের মুখে পড়ছেন৷
নির্দোষ আমোদ নয়
এক নারী তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করছিলেন এভাবে: ‘‘আমি অন্যান্য দিনের মতো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম৷ হঠাৎ খেয়াল করলাম, এক কিশোর সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় আমার পেছনে খোঁচা দিয়ে গেল৷ পেছন ফিরে আবার একটু মুচকি হাসিও দিল৷'' এই ধরনের ঘটনা নির্দোষ মনে হলেও আসলে কিন্তু নয়৷ ভুক্তভোগী মেয়েরা রাস্তাঘাটে এই রকম হয়রানি বা ‘স্ট্রিট হ্যারাসমেন্ট'-কে হালকা চোখে দেখেন না৷ তাঁদের মতে, এইভাবেই মারাত্মক ধরনের অপরাধের সূত্রপাত হয়৷ যা পরে সহিংসতায়ও রূপ নিতে পারে৷ বলেন ‘ব্রুল্ট সুরুক' বা ‘হলব্যাক'-এর উদ্যোক্তারা৷ হলব্যাকের অর্থ করলে দাঁড়ায়, ‘প্রতিবাদে গর্জে ওঠ'৷ স্ট্রিট হ্যারাসমেন্টের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে অ্যামেরিকায় গড়ে ওঠে এই নেটওয়ার্ক৷
গড়ে উঠেছে নেটওয়ার্ক
ইতোমধ্যে জার্মানিসহ ২৫ দেশের ৬২টি শহরে সক্রিয় এই আন্দোলন ‘হলব্যাক'৷ এই নেটওয়ার্কের ওয়েবসাইটে ভুক্তভোগী মেয়েরা বেনামিতে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে পারেন৷ অন্যান্যদের সঙ্গে সমস্যাটা ভাগাভাগি করতে পারেন৷ যৌন হয়রানির ধরন ধারণ বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে৷ যা যৌন ইঙ্গিত, যৌনতা প্রদর্শন থেকে শুরু করে যৌন হামলা পর্যন্ত গড়ায়৷ হলব্যাকের অন্যতম উদ্যোক্তা ইউলিয়া ব্রিলিং বলেন, এই ওয়েবসাইটে মেয়েরা কোনো সংকোচ বা দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছাড়াই এই ধরনের ঘটনা বর্ণনা করতে পেরে হালকা বোধ করেন৷ এই সব কাহিনি ইন্টারনেটের একটি ফোরামে দেয়া হয়৷ এতে করে অন্যান্য মেয়েরাও সাবধান হতে পারেন৷
হলব্যাকের প্ল্যাটফর্মে ড্রেসডেনের এক মেয়ে লিখেছেন, ‘‘হ্যালো, আমি ১৩ বছর বয়সে আলাউন পার্ক দিয়ে যাওয়ার সময় ধর্ষিত হই৷ আজ পর্যন্ত কাউকে বলিনি একথা৷''
গুগল-এর ম্যাপে লক্ষ্য করা যায়, কোথায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল৷ এটা দেখে অন্য মেয়েরা সতর্ক হতে পারেন৷ জায়গাটি এড়িয়ে চলতে পারেন৷
হ্যারাসম্যাপ প্রকল্প
হলব্যাকের প্রণোদনা জাগিয়েছিল মিশরের মেয়েরা, যেখানে যৌন হয়রানি প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা৷ সেখানে ২০১২ সালে ‘হ্যারাসম্যাপ’ নামে একটি প্রকল্প গড়ে তোলা হয়৷ কোথাও যৌন নির্যাতন ও যৌন হয়রানি ঘটলে তা তুলে ধরা হয় হ্যারাসম্যাপে৷ ভুক্তভোগী মেয়েরা এসএমএস ও টেলিফোনের মাধ্যমে খবরাখবর জানাতে পারেন৷
ইদানীং ভারত থেকেও এই ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে প্রায়ই৷ গত ডিসেম্বর মাসে দিল্লির একটি চলন্ত বাসে এক তরুণীকে দুর্বৃত্তরা গণধর্ষণ করে৷ এ ঘটনায় গোটা দেশজুড়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ৷ সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে ঘটনাটি৷ এই পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে নতুন একটি আইন পাশ হল সম্প্রতি৷ এতে অপরাধীর জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে৷
অবশ্য ভারতে নারী অধিকারবাদীরা ইন্টারনেটে বেশ কিছুদিন ধরেই সক্রিয়৷ ২০১১ সাল থেকে ‘ফাইটব্যাক' নামে একটি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা৷ মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য এই উদ্যোগটি গড়ে তোলা হয়৷ এতে ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত মোবাইল টেলিফোন ব্যবহার করা হয়৷ কোনো মেয়ে আক্রান্ত হলে সাথে সাথে এসএমএস ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতদের জানাতে পারেন এই ঘটনা৷ এর ফলে ত্বরিত গতিতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়৷
ডিজিটালের মাধ্যমে প্রতিরোধ এখন মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্ম টুইটার পর্যন্ত গড়িয়েছে৷‘চিৎকার', ‘শাউটিংব্যাক' ইত্যাদি হ্যাশট্যাগে মেয়েরা তাঁদের নির্যাতন ও হয়রানির অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারেন৷
সচেতনতা সব ক্ষেত্রে
মনোযোগ আকর্ষণের জন্য প্রচারণা খুবই জরুরি৷ বলেন, ইউলিয়া ব্রিলিং৷ নারী বৈষম্য একটি সামাজিক সমস্যা৷ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্যাতককে প্রশ্ন করা হয় না, কেন তুমি এটা করলে? বরং নির্যাতিতাকেই দোষ দেওয়া হয়৷ কেন তুমি ওখানে গিয়েছিলে? কেন ঐ রকম পোশাক পরেছিলে? ইত্যাদি ইত্যাদি৷ সবার আগে এই ধরনের চিন্তাধারাটা বদলাতে হবে৷ এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে দায়ী না করে অপরাধীকেই সামনে আনতে হবে৷
আগামী ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী স্ট্রিট হ্যারাসমেন্টের ওপর একটি বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে৷ এর ফলে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমগুলির আগ্রহ জেগে উঠবে৷ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সচেতনতা বাড়বে৷ নারী অধিকারবাদী ইউলিয়া ব্রিলিং-এর মূলমন্ত্র: ‘‘চালিয়ে যাও, সব ক্ষেত্রে লড়াই কর৷ খানিকটা সময় লাগলেও, ফল একদিন পাওয়া যাবেই৷'' [সুত্র: ডিডাব্লিউ]

লিঙ্ক