ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বাধীনতার মুল্যায়ন: বাঙালীদের অনুপ্রেরণা জাগাতে পারে
বিপ্লব শানেয়াজ, রবিবার, এপ্রিল ০৭, ২০১৩


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সুইডেন নিরপেক্ষ দেশ হিসাবে ইউরোপ এ আত্মপ্রকাশ করেছিল! যদিও সেই নিরপেক্ষতার আড়ালে প্রছন্ন নাত্সী প্রিয়তার অভিযোগ পাওয়া যায়! জার্মান সুইডেন এর প্রতিবেশী নরওয়ে কে অধিগ্রহণ করে খুব সহজে - সেখানে সন্ধেহের তীর সুইডেন এর দিকে ই! প্রতিবেশী সুইডেন থেকে নরওয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে ১৯০৫ সালে, হয়ত পুরনো সেই হিসাব এর কথা তখন সুইডিশ রাজনৈতিকদের মাঝে কাজ করছিল! যাই হোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে শান্তির দেশ নরওয়ে, তার নিজের দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল ২৫ জনকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে, ২০,০০০ জনকে কারাদন্ড দিয়ে, ২৫,০০০ জনকে অর্থনৈতিক দন্ড দিয়ে! প্রায় ৩০০ জন জার্মান বন্দীর মৃত্যু ঘটে নরওয়ে তে যুদ্ধ-পরবর্তী মাইন পরিস্কার করতে গিয়ে! হিসাব মতে যুদ্ধকালীন সময়ে ১৪০০ জন নরওয়েজিয়ান এর মৃত্যু ঘটে কন্সেনত্রাসন কাম্পে! ৩৫,০০০ কারাবন্দী থাকে যুদ্ধকালীন সময়ে! নরওয়ে তার দেশের ১৪০০ নাগরিকের মৃত্যুর সঠিক বিচার করেই তবে নিজের দেশে আইনের শাসন আর শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে!
নিরপেক্ষতার কল্যাণে সুইডেন এ তেমন নাত্সী অত্যাচার হয়নি! কিন্তু এরই মাঝে রাউল ভালেন বার্গ নামে একজন সুইডিশ ব্যবসায়ী বুদাপেস্ট থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইহুদিদের বিভিন্ন ভাবে উদ্ধার করে সুইডেন এ আশ্রয় দিয়েছিল, নাত্সী হুমকিকে উপেক্ষা করে! যুদ্ধ শেষে রাউল বন্দী হয় রাশিয়ার হাতে - সেখানেই তার মৃত্যু হয়! নিয়তির কি পরিহাস ইহুদিদের রক্ষার জন্য - জার্মানির হাত থেকে রেহাই পেলেও কম্মুনিস্ট দের হাত থেকে রেহাই পায়নি সে! অতি বাম বা অতি ডান সবাই মানবতার প্রতি হুমকি! যুদ্ধউত্তর পুনর্গঠনে যখন পুরো ইউরোপ ব্যস্ত - ঠিক তখন সুইডেন এগিয়ে যায় শিল্পবিস্তারে! সারা ইউরোপ থেকে মানুষ আসে সুইডেন এ কর্ম সংস্থানের সুযোগে! একদিকে অর্থনৈতিক বিকাশ আর অন্য দিকে কল্যাণমুখী আর বিকেন্দ্রমুখী রাষ্ট্র ব্যবস্থা - সুইডেন হয়ে ওঠে পৃথিবীর সেরা দেশগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশ! অথচ ১৮৫০ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষুধা, বেকারত্ব আর নতুন জীবনের আশায় ১৩ লক্ষ সুইডিশ বিভিন্ন সময়ে এমনকি কাঠের নৌকায় করে অতলান্তিক সাগর পাড়ি দিয়ে উত্তর আমেরিকায় বসতি স্থাপন করেছিল! বছরের দীর্ঘকাল জুড়ে প্রচন্ড ঠান্ডা আর তার সাথে সাথে কয়েক মাস ধরে সূর্যের আলোর অনুপস্থিতি, প্রচন্ড তুষারপাত আর হিমাঙ্কের নিচে গড়ে ১৫-৩০ ডিগ্রী সেল্সিউস তাপমাত্রা জীবনযাত্রাকে সংগ্রামী করে তোলে!
নরওয়েতে প্রচুর জ্বালানি তেল মজুদ আছে আর আছে মত্স্য শিল্প! আর সুইডেন এর আছে ধাতব খনিজ সম্পদ!
সম্পদের সঠিক ও সম ব্যবহার, শিল্পায়ন, শ্রমিক অধিকার, ট্রেড ইউনিয়নসহ বহু কল্যাণমুখী চিন্তা চেতনার প্রতিফলন ও উত্তরণ ঘটেছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়! শিশু, বয়স্ক, শারীরিক ও মানসিক অক্ষম ব্যক্তিদের দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করেছে! পরিবর্তে মানুষ তার আয়ের একটি বড় অংশ ট্যাক্স ব্যবস্থায় বিনা প্রশ্নে দিয়ে দিচ্ছে! সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতায়ন আর লিঙ্গ বৈসম্যদূরীকরণ এর আন্দোলন এখনও চালিয়ে যাচ্ছে! সর্বপরি মানুষে মানুষে, ভাষায় ভাষায়, ধর্মে-বর্ণে -অর্থে সবধরনের দুরত্ব ঘোচানোর কার্জ্রক্রম এখনও চালিয়ে যাচ্ছে- যা একটা চলমান প্রক্রিয়া!
আমি শুরুতেই '" নিরপেক্ষ" কথা দিয়ে আমার লেখা শুরু করেছিলাম! নরওয়ে আর সুইডেন এর নিরপেক্ষতা দিনে দিনে পূর্ণতা পেয়েছে এবং এখনও পাচ্ছে! আর তাই তারা সেই নিরপেক্ষতার জোরেই সাম্যবাদী চেতনায় একটি সমবেদনশীল ও কল্যাণমুখী সমাজ এবং রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পেরেছে! রাষ্ট্র সমাজ ব্যবস্থার উন্ন্নয়নে ভুমিকা রাখছে- আর সমাজ ব্যবস্থা নিশ্চিন্ত করছে অর্থনৈতিক আর সামাজিক নিরাপত্তা! আগামী দিনের নাগরিক শিশুদের অধিকার কঠোর ভাবে নিশ্চিন্ত করা হয়, ঠিক অন্যদিকে বিগত দিনের করদাতা - দেশ গঠনের সৈনিক বৃদ্ধদের নিরাপত্তা, সহযোগিতা সহ সার্বিক ব্যাপারগুলিও নিশ্চিন্ত করা হয় রাষ্ট্র থেকে- যদি পরিবার ব্যবস্থা শিশু আর বৃদ্ধদের সঠিক ভাবে দিক্ভাল করতে না পারে- তা হলে পরিবারের মুখাপেক্ষী হয়ে অধিকার বঞ্চিত না হয়ে - রাষ্ট্র আর সমাজ এগিয়ে আসে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে! শুধু আইনের বইয়ে এসব ব্যাপারগুলি সীমাবদ্ধ নাই- আছে এগুলি নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণএর জন্য কয়েক ধাপে মনিটরিং এর ব্যবস্থা!
কয়েকটি নিরপেক্ষতার উদাহরণ না দিলেই নয়- আমি সুইডেন এ ১২ বছর বসবাস করছি- কখনো কথাও আমি কোন ধর্মের অনুসারী তা বলতে হয়নি, লিখতে হয়নি! অথচ এখানে সরকার থেকে মসজিদ করে দিয়েছে! স্কুলগুলিতে সংস্কার বা ধর্মীয় অথবা স্বাস্থ্যগত ( আলের্জি ) যে কারণেই হোক আমি আমার মত খাবার পাব, খাবার পছন্দের অধিকার শুরু হয় শিশু বয়স থেকেই ! সন্তান জন্মের পরে প্রথম ৮ বছরের মধ্যে বাবা-মা উভয়কেই সমান ভাবে মোট ১৪ মাস ছুটির সুযোগ দেয়া হয়! শিশু অধিকার হরণের মত কারণ ঘটলে সন্তান পালন করার দায়িত্ব থেকে পিতা-মাতা বঞ্চিত হবে! যদি কোনো ছাত্রের জন্মসুত্রে মাতৃ অথবা পিতৃ-ভাষা একের অধিক হয় - তবে স্কুল থেকে সুইডিশ ও ইংলিশ এর পাশাপাশি মাতৃ-পিতৃভাষার যেকোনো একটি ভাষা শেখার জন্য সুযোগ দেয়া হয়! প্রতিমাসে যখন আয়কর দেয়া হয় - সে আয়করের একটা খুব সামান্য অংশ জমা হয় একটা খাতে- সেটা হলো মৃত্যুর পরে মৃতদেহ যে কবরে থাকবে তার মুল্য! মৃত্যুর পরেও যেন কারো প্রতি নির্ভর করতে না হয় - ব্যক্তিস্বাধীনতা ঠিক এ ভাবেই অর্জন, সমুন্নত আর অক্ষত রাখা হয়!
এতগুলো কথা কেন বলছি? হতাশা থেকে? ক্ষোভ থেকে? আশাভঙ্গের অভিশাপ থেকে?
অনেক স্বপ্ন বুকে লালন করেছি - অনেক চেতনা মনোজগতে পরিপূর্ণ করেছি - অনেক স্বপ্নভঙ্গের অশ্রুজল গোপনে শুকিয়েছে অধরে! রক্তে বাঙানো একুশ দেখেছি! ৬২-৬৬-৬৯ সবই দেখেছি! মুজিবকে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠতে দেখেছি- জাতির পিতা হয়ে রক্তাক্ত লাশ সিড়িতে পরে থাকতে দেখেছি! মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি- একবুক সাহস আর অদম্য স্পৃহা এক একটি মানুষকে করে তুলেছিল মহাকাব্য! তর্জনীর হেলনে দেখেছি ভিসুভিয়াস কে জ্বলে উঠতে! হাতবাধা - চোখবাধা মুনির চৌধুরী - জহির রায়হান দেখেছি! মন্দা দেখেছি- দেখেছি দুর্ভিক্ষ-বাসন্তী, ইয়াসমিন! ঘূর্ণিঝর-জলোচ্বাস- বন্যা- চরে ফোলা লাশ! বেহুলা গুনায়বিবি - সেলিম-দেলোয়ার - বসুনিয়া - নুর হোসেন ! জগন্নাথ হল ধসে পরা দেখেছি- দেখেছি এযুগের নক্সীকাথার সুতা-শিল্পীদের অসহায় জীবন্ত অঙ্গার হতে! দেখেছি দাঙ্গা - দেশত্যাগ - দেশভাগ! সংখালঘুকে দেখেছি আরো সংখা লঘু হয়ে যেতে! অসহায় বিশ্বজিতকে বিশ্ব তো দুরের কথা, নিজেকে জয় করার আগে - দেখেছি অন্যের অধিকারে চলে যেতে! ইনডেমিনিটি নামক মধ্যযুগীয় আইন দেখেছি! দেখেছি খুনিদের নিরাপদে বেচে থাকতে! কাঠাল- শাপলা আর রয়েল বেঙ্গলের মত ইসলামকে দেখেছি পণ্য হতে! দেখেছি ২০১৩! দেখেছি প্রজন্মের উত্তরণ - জয় বাংলার মুক্তি ! মুষ্ঠিবদ্ধ হাতগুলি সারা পৃথিবীময় ছড়িয়েছে আলো- জীর্ণতার বিসর্জনের ক্ষণ যখন এলো - তখন কিনা আত্মসমর্পণ! পশ্চাদপদতা! ক্লীবতা! মাথা হেট হয়ে আসে! নরওয়ে তার ১৪০০ নাগরিক হত্যার বিচার আদায় করেছিল- আজ আমরা ৩০ লক্ষ শহীদের ত্যাগের মুল্যদান কিছু করতে পারলাম না- পারলাম না বীরাঙ্গনা মায়ের লাঞ্চনার প্রতিশোধ নিতে - পারলাম না বোনের আব্রু ফিরিয়ে দিতে! বরং ট্রেন পুড়ছে, পুড়ছে গাড়ি- মরছে মানুষ- থেতলে যাচ্ছে পুলিশ- দূর্গার দশভুজ আজ দিশেহারা! ক্ষতিগ্রস্ত অসাম্প্রদায়িকতা - ব্যক্তি আর বাক স্বাধীনতা! ক্ষতিগ্রস্ত আমার চেতনা- আত্মবিশ্বাস!
জয় বাংলা !

লিঙ্ক