জার্মানিতে এবারের বন্যা বহু শতকের মধ্যে অনন্য - এখানে বন্যা হয় কেন?
বার্লিনের জানালা , শনিবার, জুন ০৮, ২০১৩


জার্মানিতে ‘হোখভাসার’ বা বন্যা কিছু নতুন নয়৷ তবে এ বছর দেশের ছোটবড় নদীগুলি যেভাবে কূল ভাসিয়েছে, বাঁধ ভেঙে শহরে ঢুকেছে, তা বহু শতকের মধ্যে অনন্য৷ সমস্যা বেড়েই চলেছে – কিন্তু কেন?

জার্মান টেলিভিশনে গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে নানা জায়গা থেকে পাওয়া যাচ্ছে একই ছবি৷ নালার মতো ছোট ছোট ‘নদী'-গুলো যেন খরস্রোতা নদী হয়ে উঠেছে, গ্রাম বা জনপদের মাঝখান দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গাড়ি-বাড়ি৷ বড় নদীগুলো কূল ছাপিয়ে, মাঠ-প্রান্তর ছাপিয়ে হ্রদের আকার ধারণ করেছে৷ বিভিন্ন কৃত্রিম জলাধারে ছাপাছাপি জল৷ ছোটবড় বহু শহরের কাছে ‘ডাইশ' বা বাঁধগুলি ভেজা কম্বলের মতো নরম হয়ে ভেঙে পড়ার মুখে কিংবা ভেঙে পড়েছে৷ অথবা সেগুলো বালিভর্তি প্লাস্টিকের বস্তা ফেলে শক্ত করা হচ্ছে৷

কিন্তু অনেক জায়গায় এতো করেও ‘বাড়' আটকানো যাচ্ছে না৷ দক্ষিণ-পূর্ব জার্মানির ডেগেনডর্ফ শহরের কাছে ড্যানিউব ও ইসার নদীর দু'টি বাঁধ ভেঙে বহু বাড়ি ভেসে গেছে, জল দাঁড়িয়েছে প্রায় এক তলা৷ মানুষজন শেষ মুহূর্তে বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন৷ সেখান থেকে তাদের হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা হচ্ছে৷

পূর্ব জার্মানির হালে শহরের একাংশ ঠিক ঐভাবেই ভেসে গেছে৷ দক্ষিণ জার্মানির একটি হাইওয়ে জলে ডুবে গেছে, বন্যার জল মোটরগাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, কয়েকটা ট্রাকের মাথা টাপুর মতো ঘোলাজলের উপর ভেসে রয়েছে৷ অন্যত্র, যেমন দক্ষিণের পাসাউ শহরে জল নেমে যাওয়ার পর মানুষজন, সেনা, পুলিশ, দমকল, স্বেচ্ছাসেবীরা বন্যার জলে ভেসে আসা পাঁক, মাটি আর ময়লা সরাতে ব্যস্ত৷ সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি অপরিমেয়৷

ভুলটা কোথায়?

২০০২ সালের পর আর এ সব এলাকায় এত বড় বন্যা বিপর্যয় ঘটেনি৷ চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল ১০ কোটি ইউরোর তাৎক্ষণিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন৷ সাহায্য আসছে ব্রাসেলস, অর্থাৎ ইইউ থেকেও৷ একদিকে সাহায্য, অন্যদিকে দোষারোপ৷ কারো দৃষ্টিতে জলবায়ুর পরিবর্তন দায়ী৷ কেউ বলছেন, শুধু আরো উঁচু বাঁধ দিয়ে এই বন্যা রোখা সম্ভব ছিল না৷ তার জন্য চাই পরিবেশসম্মত বন্যা সুরক্ষা৷

সেটা কী বস্তু? পরিবেশ সংগঠন ডাব্লিউডাব্লিউএফ-এর এক পানি বিশেষজ্ঞ গেয়র্গ রাস্ট বলেছেন: বিগত কয়েক বছরে আবহাওয়ার পূর্বাভাস কিংবা যান্ত্রিক উপায়ে বন্যা সুরক্ষার উপর বড় বেশি জোর দেওয়া হয়েছে৷ সেই সঙ্গে আবার আছে নদীর ধারের গ্রাম-শহরগুলির পরস্পরের মধ্যে হিংসা, দ্বেষ, রেষারেষি, নিজেদের স্বার্থ৷

এলবে নদীর কথাই ধরা যাক৷ ২০০২ সালে এলবে নদীর ভয়াবহ বন্যার পর ফেডারাল ও রাজ্য সরকারগুলি মিলে একটি সার্বিক বন্যা সুরক্ষা কর্মসূচির পরিকল্পনা করে৷ কিন্তু সে ধরনের কর্মসূচি বাস্তবে রূপায়িত করতে ১০ বছরের বেশি সময় লেগে যাবে৷ এর মধ্যে প্রতিবারের বন্যাতেই ইঞ্চি-ইঞ্চি করে জলের উচ্চতা বেড়ে চলেছে, বাড়ছে তার বিনাশের শক্তি৷ বন্যার পর পরই ‘ডাইশ' বা বাঁধগুলোর উচ্চতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা'তে আবার বিপুল পরিমাণ সময় ও অর্থ খরচ হয়৷ কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে এই অসম প্রতিযোগিতায় মানুষের পক্ষে জেতা অসম্ভব৷

করণীয় কী?

ডাব্লিউডাব্লিউএফ কিংবা জার্মানির ‘নাবু' অথবা ‘বুন্ড'-এর মতো আন্তর্জাতিক ও দেশি পরিবেশ সংগঠনগুলির মতে স্থায়িভাবে বন্যা রোখার একমাত্র পথ হল, নদ-নদীগুলোকে তাদের ‘আউয়ে' বা নদীর দু'পাশে জল ধরার মাঠ-প্রান্তর-জলাভূমি ফিরিয়ে দিতে হবে৷ তাহলে বান বা বন্যার জল এলে, তা এত তাড়াতাড়ি এক শহর থেকে আরেক শহরে পৌঁছতে পারবে না, শহরগুলো ভাসাতে পারবে না৷

শুধুমাত্র এলবে নদী বিগত কয়েক দশকে তার দু'পাড়ের প্রকৃতিদত্ত জোলো জমি ও জলজঙ্গলের ৮০ শতাংশের বেশি হারিয়েছে; সেই ‘আউয়ে' পরিবর্তিত হয়েছে গোচারণের মাঠে; কিংবা সেখানে গজিয়ে উঠেছে বাড়িঘর, কলকারখানা৷ নদীর খাত এক কথা; আর বাড়তি জল এলে, তা সাময়িকভাবে ধরে রাখার জন্য যে চরভূমির প্রয়োজন, নদীকে সেটা ফেরত না দিলে, ২০০২ সালের বন্যা কি ২০১৩ সালের বন্যার পুনরাবৃত্তি হতে বাধ্য৷ এ বন্যা প্রতিবারেই আরো ঘন ঘন হবে, তার তীব্রতা আরো বৃদ্ধি পাবে, বলেছেন বিশেষজ্ঞরা৷ >ডিডাব্লিউ/এসি/এসবি (ডিপিএ, এপি) সুত্র: আজকের বাংলা


লিঙ্ক