দেশকে গর্বিত করা মাহফুজাদের কথা: ডয়চে ভেলের ‘দ্য বব্স বেস্ট অনলাইন অ্যাক্টিভিজম’ অ্যাওয়ার্ড
বার্লিনের জানালা, রবিবার, জুন ২৩, ২০১৩


বাংলাদেশে দুঃসংবাদই বেশি থাকে সংবাদ শিরোনামে৷ এমন দেশের প্রকল্প ‘তথ্যকল্যাণী’-র ‘দ্য বব্স অ্যাওয়ার্ড’ জেতা নিঃসন্দেহে সুখবর৷ এই পুরস্কার নিতে জার্মানিতে এসে তথ্যকল্যাণীদের প্রতিনিধি মাহফুজা জানান তাঁর জীবন-যুদ্ধের কথা৷
‘যুদ্ধ' শব্দটি অবশ্য আনন্দের বার্তা খুব কমই বয়ে আনে৷ যুদ্ধ মানেই মারামারি-হানাহানি৷ সেখানে বিজয়ীর আনন্দ থাকে অবশ্যই, তবে সেই আনন্দের আড়ালে থাকে অনেক মৃত্যু্, অনেক কান্না৷ মাহফুজা আক্তার যুদ্ধে নেমেছিলেন হাসি ফোটাতে৷ চেয়েছিলেন পরিবারের অভাব-অনটন যতটা সম্ভব দূর করতে৷ শুধু ভাই-বোন, মা আর অবসরপ্রাপ্ত রেল কর্মচারী বাবার মুখে হাসি ফোটালে গল্পটা সাধারণই থেকে যেত৷
কিন্তু তথ্যকল্যাণীরা সাধারণ ঘরের ‘অসাধারণ' সব মেয়ে৷ দারিদ্র্যের মাঝে বসবাস, তাই বলে মানুষের সেবা করার আনন্দ নিতে নিতে পরিবারের সবার মুখে আহার তুলে দেয়ার ইচ্ছাপূরণের পথের সব বাধা অতিক্রমের সাহস তো কম নয়! মাহফুজা বাংলাদেশের গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার অতি সাধারণ এক পরিবারের তেমনি অসাধারণ এক মেয়ে৷
সেই প্রত্যন্ত এলাকা থেকে জীবনে প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে পা রেখেছেন মাহফুজা৷ প্রথম বিদেশ সফরই জার্মানিতে৷ শুধু আসা আর যাওয়া নয়, ১৭ থেকে ১৯ জুন – এই তিন দিন ধরে জার্মানির বন শহরে চলা ‘গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম'-এর সম্মানিত অতিথি হওয়া এবং শেষ দিনে তথ্যকল্যাণী প্রকল্পের গর্বিত কর্মী হিসেবে পুরস্কার গ্রহণ করা৷ পরিবার, এলাকাবাসী তো দূরের কথা মাহফুজা নিজেও ভাবেননি জীবনে এমন দিন কখনো আসতে পারে৷
বেসরকারি সংস্থা ডি নেট-এর প্রকল্প ‘তথ্যকল্যাণী' (ইনফোলেডি)-তে মাহফুজা এক সাধারণ কর্মী৷ কাজ করেন মাঠ পর্যায়ে৷ পরিবারে স্বচ্ছলতা নেই, উচ্চ মাধ্যমিকের পর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে এক ভাই বেকার৷ মেয়েকে বিয়ে দেয়া বা আরো বেশি পড়ানো – কোনোটাই বাবার পক্ষে সম্ভব ছিল না৷ সংসার চালানোই কঠিন, মেয়েকে পড়াবেন কী! বাবার অক্ষমতার জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও স্বাবলম্বী হয়ে মাহফুজা আক্তার আবার শুরু করেছেন লেখাপড়া৷ ভীষণ ব্যস্ততার ফাঁকে ডয়চে ভেলেকে দেয়া এই সাক্ষাৎকারে মাহফুজা পরিবারের তখনকার দুর্দশার বিবরণ দেননি৷ বিবরণ সেভাবে জানতেও চাওয়া হয়নি, বাংলাদেশের নিম্ববিত্তদের প্রতিটি ঘরে এ পরিস্থিতিতে এমন হওয়াই তো স্বাভাবিক৷
কিছুটা অস্বাভাবিক ছিল মেয়ে হয়েও মাহফুজার সংসারের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত৷ স্থানীয়দের অনেকে তাই মনে করতেন৷ তবে মাহফুজার সৌভাগ্য, একজন হিতাকাঙ্খী শিক্ষক ছিল তাঁর৷ তিনিই দিয়েছিলেন উদয়ন স্বাবলম্বী সংস্থার মাধ্যমে তথ্যকল্যাণী হয়ে পরিবার এবং সাতটি ইউনিয়নের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগের খবর৷ পরিবার এবং সমাজের কল্যাণ একসাথে৷ কাজ মূলত তথ্য দিয়ে সবার উপকার করা৷ খোঁজ-খবর নিয়ে কাজটা খুব পছন্দ হলো৷ সাইকেল চালিয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষকে ছোটখাটো চিকিৎসা সেবা দেয়া; রক্তচাপ মেপে, রক্ত পরীক্ষা করে, কোনো নারীর গর্ভে সন্তান আসছে কিনা পরীক্ষা করে জেনে কাকে কী করতে হবে বলে দেয়া; কৃ্ষকদের নানা তথ্য-পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করা, প্রয়োজনে কাউকে ছবি তুলে দেয়া, দূরের আপনের সঙ্গে স্কাইপ-এ কথা বলানো, মোবাইল ঠিক করা, অনুষ্ঠানের ভিডিও করে দেয়া, ভিডিও দেখিয়ে শিশুদের লেখাপড়ায় উৎসাহ জোগানো – সবই তো কল্যাণমূলক কাজ!
এভাবে সাতটি ইউনিয়নের মানুষের কল্যাণ করতে চেয়েও মাহফুজা পড়েছিলেন বাধার মুখে৷ প্রথমে সাইকেল চালানোর ব্যাপারটি মানতে চায়নি পরিবার৷ পরিবার মানলো, কাজে নামলেন, মাহফুজা দেখলেন, যে দেশের মেয়ে বড় হয়ে প্রধানমন্ত্রী-বিরোধী দলনেত্রী, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার – বলতে গেলে প্রায় সবই হয়, সেই দেশের একটি গ্রামের মানুষ তাঁর সাইকেল চালানো মানতে পারছে না৷ বিদ্রুপ, কটাক্ষ, সমালোচনা সবই হয়েছে৷ ভালো কাজে এসবের গুরুত্ব যত কম দেয়া যায় ততই মঙ্গল৷ সেটা বুঝতেন বলেই মাহফুজারা সুদূর জার্মানিতেও পুরস্কৃত৷ বিদেশের দৈনিকেও শীর্ষ খবরে থাকে তথ্যকল্যাণীদের বিশ্বজয়ের খবর৷
দেখতে ছোট, কাজে বড় মাহফুজা অল্প সময়ে অনেক কথাই বলেছেন ডয়চে ভেলেকে৷ কথাগুলো তাঁর একার নয়৷ বাংলাদেশের সাতটি অঞ্চলে কর্মরত ৭৯ জন তথ্যকল্যাণীর জীবনকাহিনিও মোটামুটি একইরকম৷ ‘দ্য ববস - বেস্ট অফ অনলাইন অ্যাক্টিভিজম অ্যাওয়ার্ড' তাঁদের প্রত্যেকের৷ মাহফুজা আক্তারের এই সাক্ষাৎকার আসলে সব তথ্যকল্যাণীকে শ্রদ্ধা জানানোরই প্রয়াস৷সাক্ষাৎকার: আশীষ চক্রবর্ত্তী সম্পাদনা: দেবারতি গুহ >DW.DE
< ডয়চে ভেলের মহাপরিচালক এরিক বেটারমানের সঙ্গে মাহফুজা, ফটো: ডি.ডাব্লু >

লিঙ্ক