জার্মানিতে নির্বাচন হবে ২২ শে সেপ্টেম্বর - ম্যার্কেল বনাম স্টাইনব্রুক
বার্লিনের জানালা, শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৩


বার্লিন: জার্মানিতে নির্বাচন হবে ২২ শে সেপ্টেম্বর৷ আর মাত্র ২ দিন বাঁকি, কিন্তু দৈনন্দিন জীবন যাত্রায় তার কোনো বড় ধরনের প্রভাব পরেনি৷ এটাই নিয়ম এভাবেই জনগণ তাদের বহু গণতান্ত্রিক দায়িত্বের মধ্যে ভোটপর্বকে ও একটা অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে দেখে, কারণ ভোট দেওয়াই একমাত্র গণতান্ত্রিক অধকার নয়, বরং সেই গণতন্ত্রকে লালন করতে হয় সুশাসন দিয়ে৷ জার্মানির নির্বাচনে দুটি বৃহত্তর দলের চ্যান্সেলর (প্রধানমন্ত্রী) পদপ্রার্থী হলেন একজন বর্তমান চ্যান্সেলর, ক্রিস্টিয়ান রক্ষনশীল দলের (সি.ডি.ইউ) প্রধান আঙ্গেলা ম্যার্কেল এবং অন্যজন সোশ্যাল ডেমোক্রাট দলের বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী পিয়ার স্টাইনব্রুক৷ বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই জনগনের মাঝে একটা স্বস্তির আভাস পাওয়া গেছে যে, এবারেও আঙ্গেলা ম্যার্কেল পর পর তৃতীয় বারের জন্যে দেশটির সরকার প্রধান হতে চলেছেন৷
কে এই বেক্তি আঙ্গেলা ম্যার্কেল? কেনই বা তার এত খ্যাতি, যেমন তাঁর নিজ দেশে, তেমনি পুরো ইউরোপিয়ান ইউনীয়নে?
আঙ্গেলা ম্যার্কেল রাজনীতিতে আসেন যখন তাঁর ৩৪ বছর বয়স, বলাযায় একরকম কাকতালীয় ভাবেই৷ বার্লিন ওয়াল পতনের পর ১৯৮৯ এ যখন পূর্ব-পশ্চিম জার্মানি একত্রিত হয় তখন তিনি সর্বশেষ পুর্বজার্মানির প্রধানমন্ত্রীর (লোথার ডে-মেসিয়ার) এর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে রাজনীতির মঞ্চে পদার্পণ করেন, পরবর্তিতে বৃহত্তর জার্মানির প্রথম নির্বাচনে তিনি পার্লামেন্ট সদস্য হলে, ততিকালীন চ্যান্সেলর হেলমুট কোল তাঁকে তার মন্ত্রী সভায় সর্ব কনিষ্ঠ যুব ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে, মের্কেলের (তখন ৩৫ বছর) দায়িত্বপূর্ণ রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়৷ এর পর থেকে তাকে আর কোনো দিন থেমে থাকতে দেখা যায়নি, যাকেবলে ধাপে ধাপে সফল ক্যারিয়ার তৈরী করেছেন তিনি৷ ১৯৯৮ এ যখন তত্কালীন চ্যান্সেলর হেলমুট কোল তাঁর প্রতিপক্ষ সোশ্যাল ডেমোক্রাট দলের গেরহার্ড স্রোডার এর কাছে পরাজয় হন এবং ক্রিস্টিয়ান রক্ষনশীল দলের (সি.ডি.ইউ) চাঁদা কেলেঙ্কারিতে দলের ভরাডুবি হয়, তখন এগিয়ে আসে আঙ্গেলা ম্যার্কেল, একধাপে দলের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি (মাত্র ৪৪ বছর বয়েসে সর্ব কনিষ্ঠ দল প্রধান)৷
ম্যার্কেল তার সভাপতি পদে অধিষ্টিত হওয়ার পরেই প্রাথমিকভাবে "একটি পুরুষ-শাসিত, সমাজের" রক্ষণশীল ক্যাথলিক ধর্মের গভীর শিকড় এর সঙ্গে তার পার্টি (সি.ডি.ইউ) উদারপন্থীদের একত্রিকরণে ব্যস্ত হয়ে পরেন এবং খুব সহজেই তার ভারসম্মতা রক্ষা করতে পেরেছে৷ ২০০৫ থেকে অজবদী দুই দুইবার জার্মান চ্যান্সেলর হিসাবে, অত্যান্ত দক্ষতার সাথে না হলেও, বিজ্ঞ ম্যানেজার এর মতই দেশ শাসন করেছে ম্যার্কেল৷
সমগ্র বিষয়টি তিনি সুকৌশলে ম্যানেজ করেছেন৷ জার্মানির ‘ইউরো-সংশয়বাদী'-দের তিনি সন্তুষ্ট করেছেন বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে৷ অন্যদিকে, ‘ইউরোপ-বান্ধব'-দেরও তিনি খুশি করেছেন দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ সত্ত্বেও সংস্কার উদ্যোগকে বাস্তবায়ন করে, বলে মনে করে জার্মান সংবাদ সংস্থা ডয়চে ভেলে৷
আঙ্গেলা ম্যার্কেল এর রাজনীতি তে অনেক নেতিবাচক অধ্যায় ও রয়েছে; অবশ্যই তিনি সেটা নিজেও জানেন৷ যেমন ৩৪ বছর বয়সে রাজনীতিতে আশা, পূর্ব জার্মানির সমাজ তন্ত্রিক পরিবেষে বড় হয়ে ওঠা একজন পদার্থ বিজ্ঞানী, জার্মানির মত ইউরোপের এক ধনতান্ত্রিক দেশের সরকার প্রধান হয়ে পর পর ৩ বার ক্ষমতায় থাকার পেছনে তাহলে কি এমন ইতিবাচক কারণ থাকতে পারে? প্রথমত তিনি স্বল্পভাষী (বেশি কথা বলেন না), যেটুকুই বলেন ঠিক যেন জনগনের কথারই প্রতিফলন তাঁর কথায় এবং কাজে ফুটে ওঠে, আর তার বেশির ভাগ অর্জন করেছেন তিনি তাঁর বিগত দুই বারের সরকার প্রধান থাকা কালীন সময়ে৷
এখানে আমি তাঁর বিভিন্ন সময়ের কাজের মধ্যে অতি সম্প্রতিক তিনটি ইতিবাচক কাজের উদাহরণ তুলে ধরছি:
১) যখন ২০১১ সনে জাপানের ফুকুশিমা দুর্যোগের পরে জার্মান ভোটারদের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী জার্মানির সকল পারমানবিক শক্তি কেন্দ্র গুলি বন্দ করে দেওয়ার পক্ষে ছিল, আঙ্গেলা ম্যার্কেল ও ঠিক সেই কাজটিই করলেন, অর্থাত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দাবি তিনি মেনে নিলেন৷ যদিও তিনি পারমাণবিক শক্তি নীতির একটি শক্তিশালী প্রবক্তা ছিলেন, তবুও পারমাণবিক শক্তি থেকে প্রস্থান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এতে তার জনসমর্থন বেরেছে বৈ কমেনি
২) তিনি ইউরোপীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ইউরো কঠোরতার ক্ষেত্রে; তিনি বেশ ভাল ভাবে ইউরো সংকট মোকাবেলায় পদক্ষেপ রাখতে সক্ষম হয়েছেন৷ একদিকে যেমন ইউরো মুদ্রায় ধস নামেনি অন্যদিকে জার্মান ভোটার দেরকে ও তিনি খুশি করতে পেরেছেন৷গ্রীস, ইতালি ও পর্তুগালের অর্থনৈতিক সমস্যায় বিশাল পরিমান আর্থিক সহায়তা করে, নিজের দেশে ও ইউরোপে সুনাম কুড়িয়েছেন;
৩)সম্প্রতি বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় আঙ্গেলা ম্যার্কেল নিজের দেশের ভোটারদের সমালোচনায় বেশ বিপাকে পড়েন৷ ‘মার্কিন ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি' নিজের দেশের তো বটেই, জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মানুষজনের ওপর নজরদারি করেছে বলে প্রকাশ পায়৷ অন্যদিকে এই তথ্যও জানা যায় যে, জার্মানির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা অনেক বছর ধরেই মার্কিনিদের গোয়েন্দাগিরির কথা জানতো, এমনকি সহযোগিতাও করে আসছিল তারা৷ বিষয়টি নিয়ে বিরোধীদল ও মিডিয়া সোচ্চার হয়ে ওঠে৷ বিশাল সমালোচনার সম্মুখীন হন ম্যার্কেলও৷ চ্যান্সেলর ম্যার্কেল যথারীতি কিছুদিন নিশ্চুপ ছিলেন৷ অপেক্ষা করেছেন এইভেবে, „দেখি জনগণ কি বলে“৷ অবশেষে জার্মান টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "মার্কিন গোয়েন্দাদের কার্যকলাপ হয়ত জার্মান আইনকে লঙ্ঘন করেছে৷ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগ এই ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে বলে আশা করছি";
আসলে এটাই হচ্ছে ম্যার্কেলের ইতিবাচক শক্তি৷ সমস্যা হলে প্রথমে পরিস্থিতিটা কোন দিকে যাচ্ছে সেটা বোঝার চেষ্টা করেন তিনি৷ তারপর অধিকাংশের মতামতের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন৷ বলা বাহুল্য, তাঁর এই রাজনীতির জন্য প্রশংসিত ও সমালোচিত – দুটোই হতে হয়েছে তাঁকে৷
আঙ্গেলা ম্যার্কেল জানেন তার নিজের দুর্বলতা, যেমন সোশ্যাল ডেমোক্রাট দলের চ্যান্সেলর পদ প্রার্থী পিয়ার স্টাইনব্রুক এর মত ভালো বক্তা তিনি নন, এমনকি অর্থনৈতিক বিশারদ ও তিনি নন তবুও এত সব নেতিবাচক ঘটনা সত্ত্বেও, তিনি আগামী ২২ শে সেপ্টেম্বর নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো জার্মানির চ্যান্সেলর হতে চলেছেন৷ সর্বশেষ একটি জরিপের ফলাফল অনুযায়ী আঙ্গেলা ম্যার্কেলের জয় প্রায় নিশ্চিত৷> মীর মোনাজ হক (বার্লিনের জানালা)

লিঙ্ক