অমর একুশে বইমেলা ২০১৫ - সাহিত্য সম্মেলনে জার্মান প্রফেসর হ্যান্স হার্ডার - সুইডেনের ও জার্মানির বাঙালি কবি মালিহা হক এর কাব্যগ্রন্থ "নীল আকাশ আমার"
মোনাজ হক, মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৫


অমর একুশে বইমেলা ২০১৫। বই মেলাকে ঘিরে বাংলা একাডেমী চত্বর দারুণ জমে উঠেছে লেখক-প্রকাশকদের ব্যস্ততায়। যদিও এবারের বইমেলায় কিছুটা হলেও আতঙ্ক বিরাজ করছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের জালাও-পোড়াও কর্মসূচিতে। তবুও বইমেলায় প্রানের উচ্ছাস বরাবরের মতই লক্ষনীয়। প্রিয় বন্ধু কিংবা প্রিয় লেখকের বই প্রকাশের খবর জানতে অনেকেই উন্মুখ। একইভাবে বাংলা একাডেমির মিডিয়া সেন্টারে প্রকাশিত নতুন বইয়ের খোঁজ নিতে মুখর সাংবাদিকরা। বইমেলার অর্ধেকটা সময় পেরিয়ে গেছে এখন অব্দি দুই হাজারেরও বেশি বই মেলায় এসেছে।
এবারের মেলার নতুন বৈশিষ্ঠ হলো, সাহিত্য সম্মেলন। আন্তর্জাতিক ভাবে এই সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমী, এশিয়া, আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে অনেক সাহিত্য অনুরাগীরা এই সম্মেলনে অংশগ্রহন করেছেন। উদ্ভোধনী দিনে এক জার্মান পন্ডিত, প্রফেসর ডক্টর হ্যান্স হার্ডার - জার্মানির হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটির আধুনিক দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান এর উদ্বোধনী ভাষণ সবাইকে আকর্ষণ করে। প্রফেসর হার্ডার অমর একুশে গ্রন্থমেলা - ২০১৫ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলায় অনবদ্য ভাষণ দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়েছেন। ফেসবুকের কল্যানে তাঁর বক্তব্য শোনার সুযোগ হল আমাদের। হার্ডারের বাংলা অসম্ভব সুন্দর, গোছানো, শব্দ চয়ন চমৎকার। এখানে লক্ষনীয় ব্যাপারটি হলো ড: হ্যান্স হার্ডার যখন প্রমিত বাংলায় বক্তব্য শুরু করলেন তখন অনেকেই একটু করুনার হাসি দিয়ে সমবেদনা জানাবার আগ্রহ দেখালেন, কিন্তু পরক্ষনেই সবাই বুঝতে পারলেন যে উনি বাংলা ভাষার ও বাংলা সাহিত্যের একজন জার্মান পন্ডিত, জার্মানির সবচাইতে প্রসিদ্ধ হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিন এশিয়া বিভাগের প্রধান। তাঁর সাথে বহুবার জার্মানিতে আমাদের দেখা হয়েছে কথা হয়েছে। বাংলাভাষা নিয়ে উনি গবেষণাও করেছেন। কাজে কাজেই উনার বাংলা সূচনামূলক বক্তব্যে যে অন্য কোনো ভাষার সংমিশ্রন হবেনা সেটা জানা কথা। জার্মানিতে অনেক বাংলাদেশী সম্মেলন ও সেমিনারে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বইকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করাটা জার্মানি তথা পাশ্চাত্য সমাজে একটা প্রচলিত প্রথা যাকে বলা হয় "লিটারেচার ক্রিটিক" এই লিটারেচার ক্রিটিক যত বেশি হবে বইয়ের গুণগত মান ও তত বেশি হবে। হয়ত অনেকেই ভাবছেন বইয়ের আবার সমালোচনা কেন? পাশ্চাত্য সমাজে শুধু বই নয় সবকিছুরই ভালোমন্দ নিয়ে আলোচনা হয় সমালোচনা হয়, শুধু যদি ভালোটাই প্রশংসিত হবে তাহলে মন্দটার সমালোচিত হবে না কেন?
এবারে বইমেলায় ফিরে যাই, একজনকে কথা দিয়েছি তার বইয়ের "লিটারেচার ক্রিটিক" করবার, যদিও তার পুরো বইটি এখনো হাতে পাইনি, শুধু খন্ড খন্ড কিছু কবিতা পড়েছি তবুও বইটি নিয়ে লিখতে হবে সমালোচনা করতে হবে, এটাই নিয়ম এখানে, লেখক আমার এই ঔদ্ধত্তপনাটি ক্ষমাসুন্দর মনে দেখবে কি?
মালিহা হক এর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ "নীল আকাশ আমার" প্রকৃতি প্রকাশন থেকে প্রকাশ হলো, মেলায় এসেছে গত সপ্তাহে। মালিহার আগের দুটি কাব্যগ্রন্থর প্রথমটি "তোমার ভালবাসা" নন্দিত প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৩ তে আর দ্বিতীয় কবিতার বইটি "শুধু তোমার জন্যে" প্রকৃতি প্রকাশন থেকে প্রকাশ হয়েছে ২০১৪ তে।
মালিহা হক, ইউরোপে থাকে সুইডেন ও জার্মানির বাঙালি সমাজে এক সৃজনশীল উঠতি কবি নামে পরিচিতি পাচ্ছে ধীরে ধীরে। বহুদিন থেকেই কবিতা লেখে মালিহা, তবে প্রথম দুটি কবিতার বইতে বেশির ভাগ কবিতা গুলিই একইসাথে ভালোবাসা ও কঠোর বাস্তবতার নিরিখে লেখা, ওঁর ভালোবাসার কবিতায় মাঝে মধ্যে কোথায় যেন একটা অনিশ্চয়তা নিরবধি এমনকি দারুন রহস্যের চাপ ও রয়েছে। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থটি "নীল আকাশ আমার" শুধু ভালবাসা নয় এতে প্রকৃতি ও নিসর্গ নিয়ে লেখা বেশ কিছু কবিতা স্থান পেয়েছে। এছাড়াও মালিহার তৃতীয় বইটিতে অনেক বিদ্রোহের ছাপ লক্ষনীয় হয়তবা ওঁর ছাত্রজীবনের সচেতন বামপন্থী রাজনীতি এবং ২০১৩ এর গনজাগররণী বাংলাদেশের উত্তাল পরিবেশই এর জন্যে দায়ী। সমাজকে কটাক্ষ করা কবিতার আর ভালবাসার সন্ধানে এই "নীল আকাশ আমার" কাবগ্রন্থ টি আর একটি এক্সপেরিমেন্টাল পদক্ষেপ বৈকি। ওঁর কবিতাগুলি এখনো নাতিদীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর মুখ দেখতে পারলনা আর তাই হয়তবা পাঠককে সহজেই ধরে রাখতে পারে, আর অবচেতন মনে পাঠককে কবিতার "লিটারেচার ক্রিটিক" করতে প্রলুব্ধ করে।
আর একজন কবি কাঁকন -জার্মানির ভিসবাডেন শহরে থাকে রাজশাহীর মেয়ে রুকসানা কাঁকন, কবিতা লেখা নেশা থেকে পেশায় পরিনত হতে চলছে তাঁর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া শেষ করে জার্মানিতে পারি জমায়। "পাশে সমুদ্র শুয়ে থাকে" কাঁকনের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। মূলত ভালবাসার কবিতা লেখে কাঁকন, পাশে সমুদ্র শুয়ে থাকে কাব্যগ্রন্থটি তাই ভালবাসা আর প্রানের আবেদন ছুঁয়ে আছে প্রতিটি কবিতায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেস বুকে লিখেছে -"বিদেশে এসেছি সেই কবে! ছোটবেলায় ,তারুণ্যে, প্রেমে পড়ে, আবেগে, দুঃখে, শোকে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কবিতা লিখতে পেরেছি দেশছাড়া হবার পর"

লিঙ্ক