বার্লিনে বিশ্ব-সংস্কৃতির মহামিছিল
সরাফ আহমেদ, বুধবার, মে ২৭, ২০১৫


বার্লিনের রাস্তায় এত মানুষের ঢল সচরাচর দেখ যায় না। সেই ঘটনাই ঘটল বিশ্ব সংস্কৃতির মহাযাত্রার কুড়ি বছর পূর্তির দিন। জার্মানিতে বসবাসরত নানা জাতি-সম্প্রদায় ও জার্মান সংস্কৃতিকে এক পথে বেঁধে দেবার প্রয়াসেই এই আয়োজন। জার্মান ভাষায় যার পোশাকি নাম—ক্যার্নিভ্যাল ডের কুলটুর। দক্ষিণ এশিয়া তথা বাঙালি জাতিসত্তার অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ধারণাকে বার্লিনের এই সংস্কৃতির মহাযাত্রায় তুলে ধরতেই প্রবাসী বাঙালিরা দীর্ঘ দিন থেকেই এই মহাযাত্রার অন্যতম শরিক। আর এবারের যাত্রায় বাঙালিদের মূল বিষয় ছিল, ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়া। সেই ২০০২ সাল থেকেই প্রবাসী বাঙালিরা, বার্লিনের বিশ্ব সংস্কৃতির মহাযাত্রার সঙ্গী হয়েছেন।

বিশ্বসংস্কৃতির এই মহামিছিলে নেমে এসেছে যেন সারা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা জাতির ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি। কে নেই এই মহামিছিলে! যেমন আছে দক্ষিণ ইউরোপের ব্রাজিল, পেরু, বলিভিয়ার অংশগ্রহণকারীরা, আছে আফ্রিকার নানা দেশ, আছে ক্যারিবিয়ান দেশসমূহের প্রতিনিধিরা, আছে এশিয়ার নানা দেশের সাংস্কৃতিক দলসমূহ। সব থেকে বড় কথা, এই বিশ্ব মহা মিছিলে ছিল বাংলাদেশ আর বাঙালিরা। সঙ্গে ছিল বাঙালিদের শুভানুধ্যায়ী জার্মানরা। নীল আকাশের নিচে প্রতিবছরের মতো এবারও বার্লিন শহরের প্রাণকেন্দ্র ক্রয়েজবার্গের হারমান স্কয়ার থেকে ছয় কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে যেন বিশ্ব সংস্কৃতির মেলা বসেছিল। সেই ১৯৯৫ সাল থেকেই এই মিছিলের অংশগ্রহণ করে আসছে জার্মানিতে বসবাসরত অভিবাসী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।
২৪ মে ২০১৫, রোববার বার্লিনের আকাশ ছিল ঝকমকে নীল, তাপমাত্রা ছিল ২৪ সেলসিয়াস। তপ্ত আকাশ ফাটা রোদের সঙ্গে বার্লিন ততটা পরিচিত নয় তবে বিশ্ব সংস্কৃতির মহাযাত্রার ২০ বছর পূর্তিতে সূর্যটা ঠিকমতোই জানান দিল। যেন প্রকৃতিও আছে জার্মানিতে বসবাসকারী নানা দেশের সংস্কৃতি ও তাদের ধারকদের সঙ্গে। বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের বর্ণাঢ্য জমকালো পোশাক আর গান বাজনার তালে বার্লিন হয়ে উঠেছিল ছন্দময় আর বর্ণিল।
প্রথম দিকে দক্ষিণ এশিয়া ফোরাম আর বিগত পাঁচ বছর থেকে বার্লিনের বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক ফোরামের উদ্যোগে সাফল্যের সঙ্গে বিশ্ব সংস্কৃতির মহাযাত্রার সঙ্গী হয়েছেন প্রবাসীরা। জার্মানিতে এত বিশাল মানুষের উপস্থিতিতে এই ধরনের অনুষ্ঠান বিরল। এ বছরও প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তার দুই পাণ্ডে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে প্রায় চৌদ্দ লক্ষ মানুষ হাজির হয়েছিলেন এই আন্ত-সাংস্কৃতিক মহাযাত্রার আয়োজন দেখতে। নানা সংস্কৃতির ৬২টি দলের প্রায় প্রায় পাঁচ হাজার অংশগ্রহণকারী তাদের স্ব স্ব সংস্কৃতি স্বকীয়তা নিয়ে আবারও জয় করল বার্লিনের রাজপথ। এই রাজপথে ছিল বাংলাদেশ আর বাঙালি সংস্কৃতি।
প্রতি বছরের মতো এবারও বার্লিন ও জার্মানির অন্য শহরগুলি থেকে আসা বাঙালিরা বার্লিনের রাস্তা কাঁপালেন। সামনে ছিল কুঁড়ে ঘর আর তা আচ্ছাদিত ছিল বাঘের মুখোশ আর নানা ধরনের হস্তশিল্পে। আর তার ঠিক পেছনে-মেয়েরা বাঙালিয়ানা শাড়ি পরে, কপালে টিপ, খোঁপায় নানা রঙের ফুল, দেশীয় অলংকার পরে আর ছেলেরা লুঙ্গি-ফতুয়া ও মাথায় গামছা বেঁধে যখন ক্যার্নিভ্যালের সঙ্গে জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক, আধুনিক, লোকগীতির সঙ্গে নেচে গেয়ে দীপ্ত পদভরে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন রাস্তার দুই পাশের লক্ষ মানুষ করতালি দিয়ে আর চিৎকার করে সমস্বরে তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।
এই ক্যার্নিভ্যালকে নিয়ে বার্লিনে বসবাসকারী বাঙালিদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে আসা বাঙালিদের উৎসাহ কম ছিল না। কোপেনহেগেন থেকে এসেছিলেন শিল্পী রুহুল কাজল। ৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মাইনজ থেকে এসেছিলেন অপু আলম, ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ড. হ‌ুমায়ূন কবির, মহম্মদ মন্টু, জয়িতা রহমান সোমা, সোলিংগেন থেকে মুহম্মদ সাকি, বন থেকে কোহেন, গোটিংগেনের সুজিত চৌধুরী। উৎসবের অনাবিল আনন্দে সবাই খুশি।
প্রায় ১৩ বছরের বেশি সময় ধরে এই আয়োজনে রয়েছেন বার্লিন প্রবাসী বাঙালিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। এই ক্যার্নিভ্যালে বার্লিনে বাঙালিদের সংগঠন বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক ফোরামের পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব পালন করছেন বার্লিন প্রবাসী খালেদ নোমান নমি, সৈয়দ বাবুল, মাসুদ হোসেন, মামুন আহসান খান, মিলন আল মামুন, লুৎফুল খান, মকসুদুল হক, রতন, সাকী, আবু শফিক, জাফর ইকবাল, নূরী খান, সুমনা, তামী শাহেদা, উলরিকে হক, গেরিলমা, আরেফিন তুলি, মিতালি মুখার্জী, রুনু হারুন, মিনু মজুমদার, ফেরদৌসী ও তাহমিনা শিশির প্রমুখরা। তারা জানালেন বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি তথা দক্ষিণ এশিয়াই ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমাদের ধারণাকে বিদেশে তুলে ধরতেই আমাদের এই প্রয়াস।
আশা রইবে প্রবাসী এই সব বন্ধুদের প্রচেষ্টাতে ভবিষ্যতেও বার্লিনের রাস্তায় বাঙালি সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য আরও উজ্জ্বল হবে, আর বার্লিনের পথে গ্রন্থিত হবে নানা জাত আর সংস্কৃতির মিলন মেলায়।